সফল লেখক হতে হলে

সফল লেখক হতে হলে

১. প্রথমেই ভেবে দেখুন লেখালেখির
কাজটি আপনি আসলেই উপভোগ . করেন কিনা মানে এ বিষয়ে আপনার knack আছে কিনা থাকলে নিদ্বিধায় কাজটি চালিয়ে যান। লেখক হওয়ার জন্য এটাই প্রথম ও প্রধান যোগ্যতা।

২. যারা মোহের তাগিদে বা খ্যাতির
আশায় লেখেন, আবার এটা উপভোগও
করেন না,লেখার কাজটি তারা বাদ
দিতে পারেন নিশ্চিন্ত মনে, কেননা
এক্ষেত্রে ব্যথর্তা অর্নিবায।


৩. সফল লেখককে অবশ্যই বড় পাঠক
হতে হবে। সব ধরনের, সব লেখকের বই
পড়া সম্ভব নয়। উচিতও হবেনা মোটেও।
হবু লেখকদের একটি বিষয় খুব খেয়াল
রাখতে হবে। পৃথিবী তে লেখকরা হয় মূলত দুই প্রকার, এক প্রকার হল পাঠকদের লেখক আর দ্বিতীয় প্রকার হল পাঠকদের ও লেখকদের উভয়েরই লেখক। প্রথম শ্রেনীদর মধ্যে আছেন হুমায়ন, সুনীল,সমরেশ মজুমদার, বুদ্বদেব গুহের মত লেখকরা। পাঠকদের জন্য এদের লেখাগুলো বিনোদনদায়ী ও এদের মনোজগতকে আলোড়িত করে। এরা সবাই প্রতিভাবান লেখক সন্দেহ নেই। এদের লেখার সাহিত্য মূল্য নিয়েও আমি প্রশ্ন তুলবনা।
দ্বিতীয় শ্রেনীর লেখকদের শ্রেনীতে থাকবেন, রবীন্দ্রনাথ নজরুল, জীবনানন্দ, বংকিম চন্দ্র শরৎচন্দ্র,মানিক, বিভূতি, তারাশংকর, বিমল মিত্র,দুই সৈয়দ অথাৎ মুজতবা আলী ও ওয়ালি উল্লাহ,সহ আরো কিছু নাম।
বিশ্ব সাহিত্যের দিকে তাকালে প্রথম শ্রেনীর লেখকদেন মধ্যে পড়বেন, সিডনি শেলডন, হ্যারল্ড রবিন, এরিক শেগালের মত অনেক লেখকরা। আর দ্বিতীয় শ্রেনীর মধ্যে থাকবেন হেমিংওয়ে,জ্যাক লন্ডন, অস্কার ওয়াইল্ড, ইমারসন, সমারসেট মম, সলবেলো ভিক্টর হুগো, কাফকা, টলষ্টয় আরো অনেকে। এদেরকে বলা হয় মাষ্টার নভেলিস্ট।
আমি বিশ্ব কথাসাহিত্যের জন্য পন্চ পান্ডবের একটি তালিকা করেছি এরা হলেন, চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়াইন, দস্তয়ভস্কি ও আমাদের নিজেদের অবহেলিত শরৎবাবু, সর্বকনিষ্ঠ পান্ডবটি হলেন স্বয়ং গ্রার্বিয়েল গর্সিয়া মার্কেজ জানি শরৎচন্দ নিয়ে স্বভাষীরাই অনেক বির্তক করবেন। এই পাঁচ জনকে আমি বলি master of the masters।
তৃতীয় আর এক শ্রেনীর লেখক আছেন, যাদের বই পড়ে সবচেয়ে বোদ্ধা পাঠকদেরও তার মর্মোদ্বার সম্ভব হয় নাই।হাতের কাছে সবচেয়ে ভাল উদাহরন হল কমলকুমার মজুমদার, আইরিশ সাহিত্যিক জেমস জয়েস। এদের বলা যায় ‘লেখকদের লেখক ‘। অবশ্য কম সংখ্যক লেখক এদের লেখার মর্মোদ্বারে সক্ষম হয়েছেন। এদের আবার দুই উপশ্রেনীতে ভাগ করা যায়। এক উপ শ্রেনীর লেখক হল জেমস জয়েস বা ঘরের কাছের বিষ্ণু দে। এরা দুবোর্ধ্য। আর এক উপ শ্রেনীর লেখকরা হলেন, অবোধ্য, উদাহরন, কমল কুমার মজুমদার।

  • যা বলছিলাম হবু লেখকদের প্রথম শ্রেনীর লেখকদের বই পড়ে সময়, এনার্জি ও মেধার অপচয় করা চলবেনা মোটেই,অন্তত লেখক হিসাবে নিজেকে পূর্ন প্রস্তুত না করা পর্যন্ত।
    আগামী দিনের লেখকরা পড়বেন মূলত মাস্টার রাইটারদের বই, তবে কম মানের অন্যান্য সাহিত্যও কিছুটা পড়তে হবে।

৪) নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলুন। যাতে পাঠকরা আপনার স্বকীয়তা বুঝতে ও উপভোগ করতে পারেন।

৫) কাউকে তিনি যত বড় লেখকই হোক না
অনুকরণ তো পরের কথা অনুসরনের কথাও ভূলে যান। তবে উত্তরসুরীর লেখায়
পূর্সসুরীর প্রভাব মনের অজান্তেই পড়ে যায়। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের লেখায় তার পূর্বসুরী
বিহারী লাল, লালন ফকিরের, হাফিজের
লেখার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাতে
রবীন্দ্রনাথের লেখার আবেদন বিন্দুমাত্র
কমে নাই।

১০) একজন লেখককে তার লেখালেখির কাঁচামাল যোগাড় করতে হবে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা , real life experience থেকে।
এর জন্য ভ্রমন করতে হবে ব্যাপক ট্রাভেলার হিসাবে, ট্যুরিস্ট হিসাবে নয়।
জীবন, মানুষ, তার প্রকৃত সুখ,দুঃখ, সমস্যা, জ্বালা, যন্ত্রনা তার সংস্কৃতি, প্রকৃতির বিপুল বৈচিত্র্য সম্পর্কে
ভ্রমনের মাধ্যমে যত গভীর ও বিস্তৃতভাবে জানা যায় অন্য কোন মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।
পৃথিবীর প্রায় সকল সফল লেখকরা নিজ দেশে / বিদেশে ব্যাপক ভ্রমন করেছেন।
ব্যতিক্রমও আছে। দার্শনিক কান্ট সারা জীবনে তার নিজ শহরের বাইরে দু একবার গিয়েছিলেন, তাও দেশের মধ্যেই।

রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশে তার বিশ্বব্যাপী ব্যাপক ভ্রমনের গুরুত্ব আছে।পৃথিবীর অধিকাংশ সফল লেখকরা কিস্ত মাষ্টার ট্রাভেলার।

১১) ডায়েরী লেখার অভ্যাস গড়তে হবে অবশ্যই। এর কোন বিকল্প নেই। জীবনের ছোট ছোট এমনকি তুচ্ছ ঘটনাগুলো, সাধারন কথোপকথন হয়ে উঠতে পারে ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, এমনকি পত্রিকার উপ- সম্পাদকীয় লেখার মূল্যবান উপাদান।
লিখে রাখতে হবে আপনার দৈনন্দিন জীবনের ভাবনা, অনুভূতিগুলো। নিজের ও অন্যান্যদের মুখের কথা যা রেকর্ডে রাখার মত।

আর আজকাল তো অনেক সুবিধা। হাতের কাছেই স্মার্ট ফোন সব সময়ই থাকে। এর নোটপ্যাড এই কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে সুন্দরভাবে।

আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমি যদি ইউনিভার্সিটি লাইফের আমার চিন্তা ভাবনা অনূভূতি , ক্যাম্পাস জীবনের ছোট বড় সব ঘটনা, ব্যক্তিগত সব অভিজ্ঞতা, বন্ধু, জুনিয়র, সিনিয়রদের সাথে কথাবার্তার , মিটিং, মিছিলের স্মৃতি, আড্ডার কথাবার্তার উল্লেখযোগ্য অংশ ডায়েরীতে টুকে রাখতে পারতাম, এবং সেই সাথে যদি আমার লেখালেখির প্রতিভা থাকত, তাহলে ঐ বিপুল ও মহামূল্যবান রসদ দিয়ে লেখা যেত অনবদ্য উপন্যাস, বা স্মরনীয় স্মৃতি কথা।

১২) বিশ্ব বিখ্যাত লেখক, চলচ্ছিত্র নিমার্তা,স্টিফেন কিং তরুন লেখকদের একুশটি পরার্মশ দিয়েছিলেন, যার অানিসুল হক কতৃর্ক বাংলা অনুবাদের একটি পোস্ট দেয়া হয়েছিল পাঠশালায়।

সেখানে কিং এক জায়গায় তরুনদের টিভি বন্ধ করে বই নিয়ে বসতে বলেছেন। তার মতে, টিভি বিষ স্বরুপ, টিভি দেখা সময়ের অপচয়।
আমি স্টিফেনের এ মতামতের সাথে সম্পূর্ন দ্বিমত পোষন করি। তার এ ধরনের সাধারনীকরন (Generalization) বিভ্রান্তিকর।
সফল লেখক হতে হলে প্রচুর ভাল মানের বই যেমন পড়তে হবে বেছে বেছে, তেমনি টিভির ভাল ও বৈচিত্র্যময়, শিক্ষনীয় প্রোগামগুলোও দেখতে হবে অবশ্যই। বাছবিচার ছাড়া যেমন বই পড়া যাবেনা, টিভি দেখার বেলায়ও তেমনি বাছাই করা প্রোগামগুলা দেখতে হবে যাতে করে মনোজগত সমৃদ্ব হয়।
দেশ বিদেশের ভাল ও ক্লাসিক সিনেমাগুলো অবশ্যই দেখতে হবে। মঞ্চ ও টিভির ভাল নাটক ও টেলিফিল্মও বাদ যাবেনা।
বিটিভির কিছু ধারাবাহিক নাটক, মাটি ও মানুষের মত অনুষ্ঠান, যদি কিছু মনে না করেন, ইত্যাদির মত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান গুলো আমাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করেছে, গভীরতা বাড়িয়েছে জীবন বোধের।

জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আমার নিজের ধারনাই ভীষনভাবে অসম্পূর্ন থাকত ( এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ন) যদি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক , এনিমেল প্লানেট, ডিসকভারী, হিস্ট্রি চ্যানেলের বিভন্ন ডকুমেন্টারীগুলো দেখা না হতো।

১৩) প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে হবে। পৃথিবীতে শেখার, আত্মপোলব্ধির সবচেয়ে বড় স্কুল হল প্রকৃতি।
আমরা জানি, কল্পনার বিষয়টি একজন লেখকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন। আর প্রকৃতির সংস্পর্শ, সাহচর্য অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে আমাদের কল্পনা শক্তিকে বেশী জাগিয়ে তোলে।
আমাদের দুঃখ, কষ্টের দিনগুলোতে প্রকৃতিই হয়ে উঠে বড় আশ্রয়, যা একজন লেখকের জন্য খুবই প্রয়োজন।

১৪) চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপকতা বাড়াতে প্রতিদিন না পারলেও অন্তত কয়েকদিন পর পর কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি নিজর্নতাকে বেছে নিন। নিমগ্ন হন ধ্যান, বা মেডিটেশনে। যোগাযোগ করুন আপনার অবচেতন ( sub conscious) মনের সাথে। অজর্ন করুন প্রজ্ঞা, শক্তিশালী হয়ে উঠুক ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, লেখালেখি বা সৃজনশীল যে কোন কাজে যা হয়ে উঠবে এক মহা মূল্যবান সম্পদ।

১৫) এখন গুরুত্বপূূর্ন প্রশ্ন হল লেখালেখির রসদপত্র কোথা থেকে যোগাড় করবেন। আপনার জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা, আপনার চারপাশের মানুষগুলোর জীবন ও চরিত্রই হবে আপনার লেখালেখির মূল্যবান ও কার্যকর উপকরন।

একটি উদাহরন দেই, বিখ্যাত মার্কিন কথাশিল্পী ও আমার খুব প্রিয় লেখকদের একজন হেনরী
মিলারের তরুন বয়স থেকেই জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল ডেভিড মিলার, নুট হ্যামসুনের
মত বিখ্যাত কথাশিল্পী হওয়া।
হেনরী মিলার ছিলেন বিচিত্র স্বভাবের পরষ্পরবিরোধ চরিত্রের বনার্ঢ্য জীবনযাপনকারী উষ্ণ হ্নদয়ের এক মানুষ। বহু ধরনের বিচিত্র স্বভাবের, পেশার, চরিত্রের মানুষের সাথে তিনি মেলামেশা করেন অন্তরংগভাবেই, অর্জন করেন অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা।
কথাশিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য হেনরী পৃথিবীর সব বিখ্যাত উপন্যাসগুলো ও আরো নানাবিধ অনেক বই পড়ে নিজেকে বেশ প্রস্তুত করে লিখতে বসা শুরু করেন তার কল্পনা শক্তির উপর ভর করে।
এরুপ কয়েকটি ফিকশন লিখে তা পাঠিয়ে দেন প্রকাশকদের কাছে। প্রকাশরা তার সবকটি পান্ডুলিপি ফেরত পাঠিয়ে দেন। মূষড়ে পড়েন হেনরী। এ বিষয়ে তার স্মৃতিচারনে মিলার লেখেন, All ( Scripts) came back like trained pigeon.
পরে বন্ধুদের পরার্মশে মিলার তার নিজের জীবন কাহিনী অবলম্বনে লেখেন কয়েকটি উপন্যাস। যেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, গোটা পৃথিবীতেই হইচই ফেলে দেয়। রাখঢাক না করে নিজের জীবনর ভাল, মন্দ সবকিছুই তুলে ধরেন অভিনব ভাষায়। সেই সাথে মার্কিন সমাজের ভন্ডামি, অন্তস্বারশূন্যতাও উঠে আসে
নিপুনভাবে । বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায় তার বইগুলো।
আসলে, অধিকাংশ লেখকই ‘জীবন থেকে নেয়া’ উপকরনেরসাথে কিছুটা কল্পনা মিশিয়েই সৃষ্টি করেন তাদের অমর গ্রন্থগুলো।

(Visited 25 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *